অন্ধকারে হারাধন
অখিল বাবুর আঙিনায় বসেছে সভাটা। কেউ বলছে অতা পাগল নয় আসলে পাগল সেজে থাকে। কেউ বলছে মানুষকে ভয় দেওয়াটা ওর স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ আবার সন্দেহের সুরে বলছে এটা ওর একটা রোগ। মানসিক রোগ।
কাল থেকে জ্বর ছাড়ছেই না মেয়েটার। ভূতের ভয়ে তো আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার অবস্থা বেণীর। কাল সন্ধ্যায় বেণীর মা বেণীকে সারাদিনের এঁটো বাসন গুলো ধুয়ে আনতে বলেছিল - রায়দের পুকুর থেকে। একে অমাবস্যার দিন তায় আবার সন্ধ্যা ঘুরে গিয়েছিল -- তাই একটু বেশীই ভয় পেয়েছিল মেয়েটি। থালাবাসন ফেলে চীৎকার করে ওঠে সে। তারপর একছুটে বাড়ির উঠোনে এসে পড়ে জ্ঞান হারায়। চীৎকার শুনে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে মেয়ের এ অবস্থা দেখে হকচকিয়ে যায় বেণীর মা। এবার তার চীৎকারে এক হয় সারা পাড়া। অবশেষে মায়ের কোলে জলের ঝাপটায় জ্ঞান ফিরে এলে আবার কেঁদে ওঠে মেয়েটি। আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে মা জানতে চায়- 'কি দেখেছিলে মা বেণী?' বন্ধচোখে বেণীর মনে ভেসে ওঠে সেই আতঙ্কের ছবি-- আজ এমনিতেই গা ছমছম করছিল তার। সন্ধ্যা ঘুরে যাওয়ায় কাছের থালা বাসনগুলকেও ঠিকমত দেখতে পাচ্ছিল না সে। এমন সময় পুকুরঘাটে ব্যাঙের ডুব দেওয়ার চেনা শব্দেও একবার চমকে ওঠে সে। প্রায় একই সাথে একটা শব্দ আসে ঘাটের পাশের ঝোপ থেকে। সে ভাবে হয় তো রায়দের বড় বউ গোয়াল ঘরে গেছে, গরু গুলোকে খাবার দিতে। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারে রায়দের গোয়াল ঘর থেকে নয় শব্দ টা আসছে পুকুরের দক্ষিণ পাড় থেকে এবং ক্রমেই তা এগিয়ে আসছে তারই দিকে। শব্দটা যখন ২০ হাতের মধ্যে এসে পৌছয়- উঠে দাঁড়ায় বেণী। আরও কাছে আসতে থাকে শব্দটা ক্রমে, আবছা একটা মূর্তি দেখতে পায় সে-- তারপর আর কিছু বলতে পারে না। অখিলবাবু জিজ্ঞাসা করেন-- 'কি দেখেছিলে বেণী বল'। ভয়ে জড়সড় হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে সে জানায়-- একটা অচেনা জন্তু, ভয়ঙ্কর তার চেহারা, আর তার দিকেই ছুটে আসছিল জন্তুটা। কারও আর বুঝতে অসুবিধা থাকে না এই ভয়ঙ্কর জন্তুটা আসলে কে। এ ঘটনা এ পাড়ায় নতুন নয়। হারা-পাগলার ভয়ে এই সেদিনও দত্তদের পোয়াতি বৌয়ের সে-কী দুরবস্থা। এখন এ ব্যাপারে সবাই একমত কি, এরকম আর হতে দেওয়া ঠিক হবে না। মানুষকে ভয় দেওয়া তা দিন দিন স্বভাব হয়ে যাচ্ছে হারার। এখনই এর একটা বিহিত করা দরকার।
হারা পাগলার পুরো নাম হারাধন। তার জীবনের সঙ্গে নামটা একেবারে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ পর্যন্ত জীবনের সকল পর্বের ধনই হারিয়েছে সে। -এই হারাধন কিন্তু আসলে পাগল নয়। আবার তাকে পাগল বললেও কিছু বেশী বলা হয় না। সারাদিন ঠিক থাকে- কাজ করে, খায়, ঘুময় সবই করে কিন্তু সন্ধ্যা হলেই শুরু হয় তার পাগলামি। পশ্চিম আকাশ সোনালী হতেই সোনালী দিন গুলির স্মৃতির মেঘ ভিড় করে তার মনের আকাশ জুড়ে। তারপর একটু একটু করে পরিবেশটা যতই তলিয়ে যেতে থাকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে, স্মৃতির গহ্বর থেকে উঠে আসে তার জীবনের অন্ধকার দিক টা - প্রতিক্রিয়া শুরু হয় তার মধ্যে। সূর্য অস্ত গিয়ে অন্ধকার ঘোরাল হতেই আর ঘরে বসে থাকতে পারে না সে। রায়দের পুকুরপাড় হয়ে, গাঁয়ের মোড়ল অখিলবাবুর লম্বুবাগান পেরিয়ে, জগদীশের বাঁশ বাগান ধরে ছুটে চলে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে - আপন মনে প্রলাপ বকতে বকতে। এমন কি গভীর রাতেও তাকে একা একা ঝগড়া করতে শুনেছে অনেকে।
হারার বয়স কত হবে- পঁচিশ কি ছাব্বিশ। আর তার এই রোগের বয়স প্রায় বছর তিনেক। কিন্তু বিজ্ঞান তো বলে মানুষের কোন রোগই একদিনে হয় না, তবে তার এই রোগের সূত্রপাত কোথায়?
তখন তার বয়স সাত কি আট। একদিন সন্ধ্যারাতে দাওয়ায় বসে বই পড়ছিল হারা হারিকেনের আলোয়। গ্রামের মানুষ তখন রান্না খাওয়ার পাট চুকিয়ে ফেলত সন্ধ্যারাতেই। হারার মা ও রান্না করছিল। আর হারার বাবা দাওয়াতেই বসে ফাল্গুনের বাতাস উপভোগ করছলেন মেয়েকে কোলে নিয়ে। রান্নাঘর থেকে মা হারাকে ডেকে বলেন- 'বাবা হারা, কাকিমার কাছ থেকে দুটো কাঁচা লঙ্কা নিয়ে আয় না।' হারিকেনটা নিয়ে যাবে ভেবেছিল হারা কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠলো না - সে যেই সেটা নিয়ে যেতে উদ্যত হল অন্ধকারে কেঁদে উঠলো তার বছর তিনেকের ছোট বোনটি। অগত্যা মায়ের কাছ থেকে ছোট লম্ফ জ্বালিয়ে নিয়ে চলল সে। ফাল্গুনের সন্ধ্যার বাতাসে লম্ফ নিয়ে চলা যে কত দক্ষতার কাজ তা আজকের ছেলেমেয়েরা বুঝবে না। কাকাদের রান্নাঘরের পিছনের লেবু গাছটার কাছে যেতেই হারার লম্ফ গেল নিভে। ঈশ্বর বোধহয় ইচ্ছা করেই নিভিয়ে দিল হারার লম্ফটা। তা না হলে যে সে জানতেই পারত না আসল সত্যটা। - সে শুনতে পেল রান্নাঘরে বসে তার দুই কাকা পরামর্শ করছে তার বিধবা পিসি কে হত্যা করে সম্পত্তি করায়াত্ত করার। লম্ফ ফেলে একছুটে বাড়ি এসে বাবাকে সব বলে সে। যদিও তখন কেউ গুরুত্ব দেয়নি তার কথায় কিন্তু পরদিন সকালে আর ঘুম থেকে ওঠেনি হারার পিসি।
হারা ছিল তার পিসির নয়নের মণি। বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই বিধবা হয়েছিল হারার পিসি, তাই তার সকল বাৎসল্য প্রেম ছিল হারাকে জুড়েই। পিসিই শীতের দুপুরে পাড়া থেকে খুঁজে ধরে এনে গরম জলে স্নান করাত হারাকে, অতি যত্ন সহকারে কেটে দিত নখ, পরিষ্কার করে দিত কানের ময়লা। পিসিই খেজুর গাছের পাতা দিয়ে চরকি, নারকেল পাতার ঘড়ি, চশমা বানিয়ে দিত তাকে। হারার জন্য দুধের সর তুলে রাখা, নারকেল থেকে তেল বানানোর পর তার সর তুলে রাখা, ভাত খাওয়ার সময় মাছের কাঁটা বেছে দেওয়া, গ্রীষ্মের দুপুরে বাতাবী লেবু, কাঁচা আম মেখে খাওয়ানো সবই ছিল পিসির কাজ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এমন মর্মাহত ঘটনায় কেমন যেন হয়ে গেল হারা - মুখে একটা স্থায়ী কালো ছাপ দেখা গেল তার, হাসতে ভুলে গেল সে, জনমানসের সঙ্গ অসহ্য হয়ে উঠলো তার কাছে।
তারপর থেকে বোনই হল হারার সারাক্ষণের সাথী। বোনকে নিয়ে সে যায় মাছ ধরতে, পাটকাঠির মাথায় জিবলি গাছের আঠা দিয়ে ফড়িং ধরে এনে দেয়, পেয়ারা চুরি করে আনে দত্তদের বাগান থেকে। বোনের সাথে কানাপুকুর থেকে আতা পেড়ে এনে কুড়োর বস্তায় পাকতে দেওয়া, রাত থাকতে ঘুম থেকে উঠে বোনকে নিয়ে আম কুড়তে যাওয়া প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে বোন কে ঘিরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে হারা। কিন্তু নাম যে তার হারাধন - বোন কেও হারাতে হল তার। রাতের অন্ধকারে সাপে কামড়েছিল হারার বোন কে, সেই অন্ধকারেই হারা দৌড়েছিল ডাক্তার ডাকতে। কিন্তু স্থূলকায় ডাক্তার হার মানল যমদূতের বেগের কাছে। এবার হারার চেহারা গেল অর্ধেক হয়ে, খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিল সে।
দু'বছরের মধ্যে দুজন কাছের মানুষকে হারানোর দুঃখ হারাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল রায়দের মেয়ে ঝিনুক। হারার মুখের অসহায় ভাষাটা সে পরতে পেরেছিল অন্তর দিয়ে, তার কোমল হৃদয় বিদ্ধ হয়েছিল হারার অসহায়তার বাণে। অন্তরের অন্তঃস্থল হতে কি যেন একটা টান অনুভব করত সে হারার প্রতি। তাই প্রায় প্রত্যেকদিনই বিকালে ঘুরতে বের হত সে হারার সঙ্গে - পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্যের ম্লান আলোয় তারা হাঁটত মাঠের পথ ধরে।
বছর তিন আগের এক শীতের বিকাল, হারা আর ঝিনুক হেঁটে চলেছে মাঠের পথ ধরে।
বাড়ি থেকে ঝিনুক নারকেলনাড়ু এনেছিল হারার জন্য। উদাস মনে তাই খেতে খেতে সরষে ক্ষেতের আল বেয়ে হেঁটে চলেছে তারা। সূর্য যখন বসল পাটে ওরাও বসল ঘাসের মাঠে। ক্রমে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, বাড়ি ফেরার কথা ভুলেই গেল তারা। সন্ধ্যার অন্ধকার যত ঘনীভূত হতে থাকল ততই ঘনীভূত হতে থাকল তাদের প্রেমের আবেগ। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল লন্ঠনের আলো আর কর্কশ গলার চীৎকারে।
পরদিন সন্ধ্যায় বিচার বসল অখিলবাবুর আঙিনায়। বিচারে ঠিক হল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিতে হবে ঝিনুক কে। আর বিয়ের আগে পর্যন্ত তাকে রাখতে হবে ঘরবন্দি করে। ঝিনুকের বিয়ের যাবতীয় খরচ দাবি করা হল হারার কাছে - যদিও সেই সুযোগ টা তাকে আর দেয় নি ঝিনুক। যে ঝিনুকের খোলা দুটি ভেদ করে একটি দুর্লভ, দুর্মূল্য নিরেট অম্লান বিন্দু ভরে দিয়েছে তার সমস্ত শূন্যতা, সেই অক্ষত বিন্দুকেই মুক্তার রূপ দিতে চায় সে। কিন্তু দূষিত জলাশয়য় মুক্তা সৃষ্টির প্রতিকূল হাওয়ায় অগত্যা আত্মহত্যার পথই বেছে নেয় সে।
হারার মন টা যেন একটা সুপারি গাছ -- ঝড়ে নুয়ে পড়েছে বারবার কিন্তু পরক্ষণেই দাঁড়িয়েছে সোজা হয়ে। কিন্তু এবার বাজ পড়ল তাতে। সেই থেকে সে যেন 'ভাবে ভোলা বলাই' - কার সাথে তেমন একটা কথা কয় না সে, নির্বিকার হয়ে চেয়ে থাকে আকাশ পানে, কেবল সন্ধ্যা হলে একান্তে দুটো আলাপ করতে চায় অন্ধকারের সাথে। তার জীবন পরীক্ষার সকল প্রশ্নই অন্ধকারের কাছে। সে যখনই জাকে ভালোবেসেছে, কাছে টেনেছে, জড়িয়ে ধরেছে তাকেই কেড়ে নিয়েছে ভাগ্য - যার প্রত্যেকটা ঘটনার একমাত্র সাক্ষী অন্ধকার। আর রাতই তো অন্ধকারের আঁধার, গভীর রাত তো আবার অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ।
আজকের পরিবেশটা যেন বেশ গম্ভীর। অখিলবাবুর আঙিনায় মাদুর পাতা, মাঝে একটা লন্ঠন ঘিরে বসে আছে গাঁয়ের বিজ্ঞজনেরা। বেণী কে সাথে করে তার বাবা মা বসেছে অখিল বাবুর পাশে। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে হারা বসে আছে দুই হাঁটুর মাঝে মাথা গুঁজে ।
যারা এই সভা আলোড়িত করে অভিযোগের ঢেউ তুলছে তারা কি কেউ পারে রাতের সাথে আলাপ করতে?
কথা সেটা নয় -- কথা হল আজ অখিলবাবুর বাড়িতে যে সভাটা বসেছে তাও সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে।
১২-০২-২০১৩
No comments:
Post a Comment